ঢাকা ০২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সারাদেশে ধারাবাহিক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটসের উদ্বেগ সারাদেশে শিশু ধারাবাহিক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটসের উদ্বেগ জবিতে জকসুর উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আগামীকাল জবি আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে তরিকুল-পলাশ জবিতে র‍্যাগিং মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার লক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন ছাত্রদল নেতার ইবিস্থ আইইউসানস’র নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠিত ঈদে বিভাগীয় শহরে বাসের আবেদন জকসুর সীমান্তে হত্যা ও মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদে জবিতে জাতীয় ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ সীমান্তে হত্যা ও মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদে জবিতে জাতীয় ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ ইডেন কলেজ ছাত্রীদের ‘নষ্টা’ বললেন ইবি ছাত্রদল নেতা, সমালোচনা

জঙ্গলের রাজা যখন আতঙ্কের নাম: মধুটিলা গারো পল্লির নিঃশব্দ যুদ্ধ

  • আপডেট সময় : ১০:১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
  • ১৭১০ বার পড়া হয়েছে

লেখক: মো: তৌহিদুলইসলাম
বাংলাদেশের প্রান্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গারোরা অন্যতম। যুগের পর যুগ ধরে তারা আমাদের পাহাড় ও সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে আসছে। তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, আর অস্তিত্বের ভেতর যেন মিশে আছে বন, পাহাড়, গাছপালা আর জীবজন্তু। আমাদের মিডিয়ায়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে, গারোদের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে বারবার। কখনও তাদের দারিদ্র্যের চিত্র, কখনও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, আবার কখনও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

তবে এই প্রচলিত চিত্রের বাইরেও একটি অদেখা, উপেক্ষিত বাস্তবতা লুকিয়ে আছে—যা শেরপুরের মধুটিলা গারো পল্লিতে না গেলে হয়তো জানা হতো না। আমি গিয়েছিলাম তাদের জীবনযাত্রা সরাসরি দেখতে, শুনতে। প্রস্তুত ছিলাম বিদ্যুৎ সংকট, ভাষাগত শিক্ষা সমস্যা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার কথা শুনবো বলে। কিন্তু যা দেখলাম, যা শুনলাম, তা এক কথায় (নিস্তব্ধ) করে দেওয়ার মতো।

সন্ধ্যা নামলেই এই গারো পল্লির মানুষজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা, কিন্তু প্রতিদিনকার পরিচিত আতঙ্ক। তারা বলে, “রাত মানেই যুদ্ধ।” এই যুদ্ধ কার সঙ্গে? বন্য হাতির সঙ্গে।

প্রতিদিন রাত গভীর হলেই ২০-২৫টির মতো হাতির একটি দল মিছিলের মতো বেরিয়ে আসে নিকটবর্তী জঙ্গল থেকে। লক্ষ্য একটাই—মানুষের বসতি, ঘরবাড়ি, শস্যক্ষেত, গবাদিপশুর ঘর। তারা কিছুই মানে না, কিছুই ছাড়ে না। টিনের চালা ভেঙে ফেলে, বাঁশের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়, ধানের ক্ষেত চষে যায় বিশাল পায়ের ছাপ ফেলে। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে কাঁপতে থাকে—কে জানে এবার কোন বাড়িটা টার্গেট হবে!

এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে গারোদের হাতে নেই কোনো আধুনিক প্রযুক্তি, নেই নিরাপত্তা বাহিনী। তারা আগুন জ্বালায় মশালে, বাঁশ কেটে বানায় তাড়ানোর অস্ত্র, একে অপরকে সতর্ক করতে বাজায় হুঁইসেল। কেউ কেউ সারারাত জেগে পাহারা দেয় গ্রাম রক্ষা করতে। ছোট ছোট শিশুকে বুকে নিয়ে মা-বাবারা বসে থাকে কোন কোণে—এই ভয়ে, যদি কিছু হয়!

একজন বৃদ্ধ গারো নারী জানালেন, “আমার স্বামী হাতির ধাক্কায় আহত হয়েছেন। ঘর ভেঙে গিয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে কাঁথা পেতে ঘুমাই। কিন্তু হাতির ভয়ে চোখে ঘুম আসে না।”

হতবাক ব্যাপার হলো, এই ভয়াবহ সংকট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। “সরকার জানে, কিন্তু কিছু করে না”—এমন অভিযোগ স্থানীয় প্রায় সব মানুষের মুখে মুখে। কেউ আসে ছবি তোলে, কিছু ফর্ম ভরায়, আর চলে যায়। তাতে কি হাতি আসা বন্ধ হয়? ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, মৌলিক নিরাপত্তার চেষ্টাও নেই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন দিয়ে যেন শুধু মানুষকেই শাস্তি দেওয়া হয়, প্রকৃত সমস্যাটির দিকে কেউ তাকায় না।

অথচ এসব মানুষেরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তারা কর দেয়, ভোট দেয়, তাদেরও অধিকার আছে শান্তিতে বসবাস করার, বাঁচার, ভালো থাকার। কিন্তু তারা এখন যেন পরিত্যক্ত এক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের আলো যেখানে পৌঁছায়, সেখানে কেন পৌঁছে না এই ভয়কে প্রতিরোধ করার কোনো শক্তি?

হ্যাঁ, গারোদের বিদ্যুৎ সমস্যা আছে, স্কুলে গারো ভাষার শিক্ষকের অভাব আছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ থাকে না—সব সত্য। কিন্তু আজ তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হলো: বেঁচে থাকা। তারা যদি প্রতিদিন ঘুমাতে না পারে, যদি প্রতিরাতে আতঙ্কে কাটাতে হয়, তাহলে আর কোনো উন্নয়নের গল্পই অর্থপূর্ণ থাকে না।

একজন গারো তরুণ বলেছিলেন, “আমরা শুধু একটা জিনিস চাই—নিরাপদে ঘুমাতে পারি যেন।”
এই চাওয়াটা কি এত বড় চাওয়া?

এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করা, বৈজ্ঞানিকভাবে হস্তক্ষেপ করে তাদের জঙ্গলে ফেরানোর ব্যবস্থা, গ্রাম ও বনভূমির মাঝখানে ইকো-ব্যারিয়ার তৈরি করা, এবং সর্বোপরি স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ—এসব কিছুই বাস্তবসম্মত এবং সম্ভব।

মিডিয়ার, গবেষকদের, ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই ‘অদৃশ্য আতঙ্ক’কে দৃশ্যমান করা। কারণ আমাদের উন্নয়নের গল্প শুধুই ইট-কাঠের অবকাঠামো দিয়ে নয়, প্রান্তিক মানুষের মুখের হাঁসির আলো দিয়েই পরিপূর্ণ হয়।

মধুটিলার গারো পল্লি আজ শুধু একটা এলাকা নয়, এটা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের এক নিঃশব্দ প্রতীক—যেখানে মানুষ বাঁচতে চায়, ভালোবাসতে চায়, আর শুধু একটু নিশ্চিন্ত ঘুম চায়।

লেখক পরিচিতি: [মো: তৌহিদুল ইসলাম], শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, চতুর্থ বর্ষ, শিক্ষাবর্ষ ২০২০ ২০২১ ।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে ধারাবাহিক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটসের উদ্বেগ

জঙ্গলের রাজা যখন আতঙ্কের নাম: মধুটিলা গারো পল্লির নিঃশব্দ যুদ্ধ

আপডেট সময় : ১০:১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫

লেখক: মো: তৌহিদুলইসলাম
বাংলাদেশের প্রান্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গারোরা অন্যতম। যুগের পর যুগ ধরে তারা আমাদের পাহাড় ও সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে আসছে। তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, আর অস্তিত্বের ভেতর যেন মিশে আছে বন, পাহাড়, গাছপালা আর জীবজন্তু। আমাদের মিডিয়ায়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে, গারোদের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে বারবার। কখনও তাদের দারিদ্র্যের চিত্র, কখনও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, আবার কখনও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

তবে এই প্রচলিত চিত্রের বাইরেও একটি অদেখা, উপেক্ষিত বাস্তবতা লুকিয়ে আছে—যা শেরপুরের মধুটিলা গারো পল্লিতে না গেলে হয়তো জানা হতো না। আমি গিয়েছিলাম তাদের জীবনযাত্রা সরাসরি দেখতে, শুনতে। প্রস্তুত ছিলাম বিদ্যুৎ সংকট, ভাষাগত শিক্ষা সমস্যা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার কথা শুনবো বলে। কিন্তু যা দেখলাম, যা শুনলাম, তা এক কথায় (নিস্তব্ধ) করে দেওয়ার মতো।

সন্ধ্যা নামলেই এই গারো পল্লির মানুষজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা, কিন্তু প্রতিদিনকার পরিচিত আতঙ্ক। তারা বলে, “রাত মানেই যুদ্ধ।” এই যুদ্ধ কার সঙ্গে? বন্য হাতির সঙ্গে।

প্রতিদিন রাত গভীর হলেই ২০-২৫টির মতো হাতির একটি দল মিছিলের মতো বেরিয়ে আসে নিকটবর্তী জঙ্গল থেকে। লক্ষ্য একটাই—মানুষের বসতি, ঘরবাড়ি, শস্যক্ষেত, গবাদিপশুর ঘর। তারা কিছুই মানে না, কিছুই ছাড়ে না। টিনের চালা ভেঙে ফেলে, বাঁশের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়, ধানের ক্ষেত চষে যায় বিশাল পায়ের ছাপ ফেলে। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে কাঁপতে থাকে—কে জানে এবার কোন বাড়িটা টার্গেট হবে!

এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে গারোদের হাতে নেই কোনো আধুনিক প্রযুক্তি, নেই নিরাপত্তা বাহিনী। তারা আগুন জ্বালায় মশালে, বাঁশ কেটে বানায় তাড়ানোর অস্ত্র, একে অপরকে সতর্ক করতে বাজায় হুঁইসেল। কেউ কেউ সারারাত জেগে পাহারা দেয় গ্রাম রক্ষা করতে। ছোট ছোট শিশুকে বুকে নিয়ে মা-বাবারা বসে থাকে কোন কোণে—এই ভয়ে, যদি কিছু হয়!

একজন বৃদ্ধ গারো নারী জানালেন, “আমার স্বামী হাতির ধাক্কায় আহত হয়েছেন। ঘর ভেঙে গিয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে কাঁথা পেতে ঘুমাই। কিন্তু হাতির ভয়ে চোখে ঘুম আসে না।”

হতবাক ব্যাপার হলো, এই ভয়াবহ সংকট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। “সরকার জানে, কিন্তু কিছু করে না”—এমন অভিযোগ স্থানীয় প্রায় সব মানুষের মুখে মুখে। কেউ আসে ছবি তোলে, কিছু ফর্ম ভরায়, আর চলে যায়। তাতে কি হাতি আসা বন্ধ হয়? ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, মৌলিক নিরাপত্তার চেষ্টাও নেই। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন দিয়ে যেন শুধু মানুষকেই শাস্তি দেওয়া হয়, প্রকৃত সমস্যাটির দিকে কেউ তাকায় না।

অথচ এসব মানুষেরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তারা কর দেয়, ভোট দেয়, তাদেরও অধিকার আছে শান্তিতে বসবাস করার, বাঁচার, ভালো থাকার। কিন্তু তারা এখন যেন পরিত্যক্ত এক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের আলো যেখানে পৌঁছায়, সেখানে কেন পৌঁছে না এই ভয়কে প্রতিরোধ করার কোনো শক্তি?

হ্যাঁ, গারোদের বিদ্যুৎ সমস্যা আছে, স্কুলে গারো ভাষার শিক্ষকের অভাব আছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ থাকে না—সব সত্য। কিন্তু আজ তাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হলো: বেঁচে থাকা। তারা যদি প্রতিদিন ঘুমাতে না পারে, যদি প্রতিরাতে আতঙ্কে কাটাতে হয়, তাহলে আর কোনো উন্নয়নের গল্পই অর্থপূর্ণ থাকে না।

একজন গারো তরুণ বলেছিলেন, “আমরা শুধু একটা জিনিস চাই—নিরাপদে ঘুমাতে পারি যেন।”
এই চাওয়াটা কি এত বড় চাওয়া?

এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করা, বৈজ্ঞানিকভাবে হস্তক্ষেপ করে তাদের জঙ্গলে ফেরানোর ব্যবস্থা, গ্রাম ও বনভূমির মাঝখানে ইকো-ব্যারিয়ার তৈরি করা, এবং সর্বোপরি স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ—এসব কিছুই বাস্তবসম্মত এবং সম্ভব।

মিডিয়ার, গবেষকদের, ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই ‘অদৃশ্য আতঙ্ক’কে দৃশ্যমান করা। কারণ আমাদের উন্নয়নের গল্প শুধুই ইট-কাঠের অবকাঠামো দিয়ে নয়, প্রান্তিক মানুষের মুখের হাঁসির আলো দিয়েই পরিপূর্ণ হয়।

মধুটিলার গারো পল্লি আজ শুধু একটা এলাকা নয়, এটা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের এক নিঃশব্দ প্রতীক—যেখানে মানুষ বাঁচতে চায়, ভালোবাসতে চায়, আর শুধু একটু নিশ্চিন্ত ঘুম চায়।

লেখক পরিচিতি: [মো: তৌহিদুল ইসলাম], শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, চতুর্থ বর্ষ, শিক্ষাবর্ষ ২০২০ ২০২১ ।