ডেস্ক নিউজ:
জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে গঠিত আপ বাংলাদেশ নামক সংগঠনের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ তার নিজস্ব ফেসবুক পেইজে আন্দোলন সম্পর্কিত এক পোস্ট লেখেন। তা হুবহু তুলে ধরা হলো।
‘ ৫ই জুন যখন কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তখনই ঢাবি শিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ আমাকে কল করে এব্যাপারে পরামর্শ চায়। আমি তখন পরামর্শ দেই, আন্দোলন আরো জমে উঠলে পরে সর্বশক্তি দিয়ে নামতে। এভাবেই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফরহাদ, সিবগাতুল্লাহ, ও সাদিকের সাথে আমার কথা হচ্ছিলো৷ যেহেতু তিনজনই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনকালে আমার জনশক্তি ছিলো, সেহেতু বিভিন্ন বিষয়ে শলাপরামর্শ করা ও আলাপ-আলোচনা আমাদের মধ্যে চালু ছিলো।
১৪ই জুলাই রাতে ক্যাম্পাসে ‘আমি কে, তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার’ শ্লোগান পরবর্তী সময়ে একটা নতুন উদ্দীপনা তৈরী হয়৷ কারণ, এর মধ্য দিয়ে হাসিনার আদারিং ও ট্যাগিং করে ন্যায্য দাবীর আন্দোলন ভন্ডুলের প্রচেষ্টা শিক্ষার্থীরা নস্যাৎ করে দেয়। এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ভাইদের নিয়ে একটি গ্রুপে (গ্রুপ-১) হাসিনার পতনের ব্যাপারে একটা আশা তৈরি হয় (এইগ্রুপে সাদিক, ফরহাদ ছিলো না)। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতিদের নিয়ে একটা গ্রুপে (গ্রুপ-২) আমরা আলোচনা করতে শুরু করি আন্দোলনটি কোনভাবে এগুনো যেতে পারে। সেইগ্রুপে মীর্জা গালিব ভাই, রিফাত, সাদিক, সিবগাতুল্লাহও ছিলো। সেসময় আমরা জুমে বেশ কয়েকটি মিটিং করি করণীয় নির্ধারণ নিয়ে।
১৬ ই জুলাই যখন আবু সাঈদ, ওয়াসীম, শান্তসহ ৬ জনকে হত্যা করা হয়, তখন আলোচনা হয় যে, মিনিমাম ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা ছাড়া এই রক্তের দাম শোধ হবে না। এরপর রাতেই ছাত্রলীগকে হলছাড়া করে শিক্ষার্থীরা যেখানে সাবেক বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল (যাদের তখনো হলে বৈধ সীট আছে) ভাইয়েরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। গ্রুপ-১ এ আসতে থাকে একের পর এক আপডেট। কোন হলে কী হচ্ছে এসব৷ আমরাও বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে থাকি। সেসময় শিক্ষার্থীরা একটা কাগজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ বেশ কয়েকটি মর্মে হল প্রভোস্টদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়৷
১৭ই জুলাই যখন হল ছেড়ে দিতে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে, তখন হল না ছাড়ার ব্যাপারেই আলোচনা হয়৷ কিন্তু রাতের দিকে হলগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং নিরাপত্তা সংকট তৈরী হওয়ায় হল ছেড়ে দিতে বলা হয়। এবং তখন সাদিকের সহযোগিতা চাওয়ার প্রেক্ষিতে আমরা শিক্ষার্থীদের রাতে আবাসনের জন্য গ্রুপ-১ এ সহযোগিতা চাই, অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে। সবাই তখন এই আন্দোলনে কন্ট্রিবিউট করার জন্য উন্মুখ।, প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থীর রাতে থাকার ব্যবস্থা হয় গ্রুপ-১ এর মাধ্যমে।
ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যপট পাল্টানোর এসময়টাতেই সাদিক কিছু দফা শেয়ার করে গ্রুপ-২ তে। যেহেতু রক্ত ঝরেছে, জীবন দিতে হয়েছে, ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করে শিক্ষার্থীরা নো রিটার্ন পজিশনে চলে গেছে, সেহেতু এব্যাপারে সবাই একমত যে শুধু কোটা বাতিল বা সংস্কার করাই সমাধান হতে পারে না। সাদিকের শেয়ার করা দফাগুলো নিয়ে গ্রুপ-২ এর অনলাইনে মিটিং হয় এবং ৯ দফার একটা ড্রাফট তৈরী করা হয়। এ আলাপও হয় যে, সর্বনিম্ন ছাত্রলীগের রাজনীতি ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ হতে হবে।
১৮ই জুলাই যখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে ও পুলিশের হামলার শিকার হয় এবং নর্থসাউথ, ইস্টওয়েস্টসহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা একযোগে ব্র্যাকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে, তখন আন্দোলনে আসে ভিন্ন মাত্রা, সঞ্চার হয় নতুন প্রাণের। এসময় আমি ও রাফে সালমান রিফাত মেডিকেল জোন শিবিরের সাবেক সভাপতি মিনহাজ ভাই ও রেদওয়ান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের কাছে এম্বুলেন্স ও চিকিৎসার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতা চাই। তখন একটি গ্রুপ তৈরী করা হয় যেখানে এম্বুলেন্স সহযোগিতা ও কোন হাসপাতালে কোন ডাক্তার আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবেন সেতালিকা শেয়ার করেন মেডিকেলের ভাইয়েরা। এভাবেই কাজ চলতে থাকে।
ঐদিন রাতেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় ও কারফিউ জারি করা হয়। এরপর চলে অফলাইন কলে যোগাযোগ। আমি ঢাকার বিভিন্ন স্পটে সাবেক ভাইদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনের আপডেট নিতে থাকি ও নিজে আন্দোলনে চিটাংরোড-যাত্রাবাড়ি রুটে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে থাকি। তখন অফলাইন কলে রিফাত, সাদিক ও সিবগাতুল্লাহর সাথে কয়েকবার কথা হয়।
এরপর ইন্টারনেট ফিরে আসলে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া, সাদিক, ফরহাদ ও সিবগাতুল্লাহর সাথে কথা বলা ও গ্রুপগুলোতে আলোচনা চলতে থাকে। প্রোফাইল লাল করা, রিমেম্বার আওয়ার হিরোজসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ক্ষেত্রে সাদিকের সাথে কথা হয় এবং আমার পরামর্শ কিছু মৌখিক ও কিছু লিখিতভাবে শেয়ার করি। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং ক্রিয়েটিভ কিছু লোকজনসহ একটা গ্রুপে (গ্রুপ-৩) সাদিক ও ফরহাদ আমাকে যুক্ত করে। সেখানে আন্দোলনের গতিবিধি, আপডেট ও করণীয় নিয়ে আলাপ চলতে থাকে।
এরইমধ্যে ৩রা আগস্ট একদফা ঘোষণার দিনে রাতে জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে গ্রুপ-২ এ বিশদ আলোচনা চলে। সেসময় আসিফের একটা ফেসবুক পোস্টের প্রেক্ষিতে রাতভর আমার সাথে আলোচনা হয় আসিফ, মাহফুজ ও রিফাত, সাদিকসহ সাবেক সভাপতিদের সাথে। ‘ছাত্রনেতৃত্বই সরকারের রূপরেখার একমাত্র অংশীদার’ এই অংশের ক্ষেত্রে আমি/আমরা বলি যে, এটা এভাবে লিখলে আন্দোলনের অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা আন্দোলন থেকে সরে যেতে পারেন, আন্দোলন বিভাজিত ও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন আলোচনার প্রেক্ষিতে মূল/অন্যতম অংশীদার হিসেবে লিখার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ৪ঠা আগস্ট গণভবন ঘেরাও কেন্দ্রিক আলোচনা চলতে থাকে গ্রুপ-৩ এ। নানা পরিকল্পনা শেয়ার করা হয়, যেখানে আমিসহ বাকিরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করি। তারপর ৬ আগস্ট লংমার্চ ও ৫ আগস্ট শ্রমিক ও নারী সমাবেশ ঘোষণার প্রেক্ষিতে আমি তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করি৷ জানাই, এরকম সুশীল কর্মসূচি আমাদের মৃত্যু ডেকে আনবে। শরফুদ্দিন ভাই, সাদিক ও আসিফের সাথে কথা হয়। আমি বেশ উত্তেজিত মুডেই সেসময় কথা বলেছি।
এরপর আসলো কাঙ্ক্ষিত ৫ই আগস্ট। আকাঙ্ক্ষিত বিজয়।
এভাবেই আন্দোলনে আমি যুক্ত ছিলাম নানাভাবে। প্রথমত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সাবেক সভাপতি এবং সিবগাতুল্লাহ, সাদিক ও ফরহাদের সরাসরি দায়িত্বশীল ছিলাম বিধায় আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় যুক্ত ছিলাম। এছাড়া বিশেষত: হাসনাত ও মাহফুজের সাথে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক ছিলো দীর্ঘদিনের।
এরকম একটা গণআন্দোলনে কর্মসূচি প্রণয়নে আলোচনা ও পরামর্শ হয় নানাপর্যায়ের মানুষজনের সাথে। বিভিন্নভাবেই যুক্ত থাকে অনেক মানুষ। সেসূত্রেই সাদিক ও ফরহাদ বিভিন্নজনের সাথেই আলাপ ও পরামর্শ করেছে। একইকথা প্রযোজ্য, নাহিদ, আসিফ ও মাহফুজের ক্ষেত্রেও। আমার সাথেও সেসূত্র ধরেই নানান কথা হয়েছে। আমিও পরামর্শ দিয়েছি। বিভিন্ন পলিসি আলোচনায় অংশ নিয়েছি।
আমি আমার সাধ্যমতন কন্ট্রিবিউট করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। প্রত্যেকেই যার যার জায়গা থেকে অবদান রেখেছেন বিধায় আমরা একটা দানবকে সরাতে সক্ষম হয়েছি। তারপরও আন্দোলনের একটা নীতিনির্ধারণী মুখ থাকে যার কেন্দ্রবিন্দুতে অন্যদের পাশাপাশি ছিলো ঢাবি শিবিরের নেতৃবৃন্দ। তথাপি জুলাই সবার, গণমানুষের, ছাত্র-জনতার, শহীদ-আহতের, জুলাই যোদ্ধার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল পক্ষের।
আন্দোলনের পুরো সময়ে আমার সরাসরি সংযুক্তি ছিলো। আমি নিজে প্রতিদিন রাজপথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি, স্বচক্ষে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ হতে দেখেছি, দেখেছি আমার ভাই-বোনের গুলিবিদ্ধ লাশ। আমার জন্য অনুপ্রেরণার যে, বাংলাদেশকে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত করার লড়াইয়ে আমিও একজন অংশীদার। এখন আমি বাকি লড়াইটা পূর্ণ করতে চাই দেশ গড়া এবং দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করার মাধ্যমে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিপ্লবে পরিণত করতে জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। আল্লাহ মালিক।’











